ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

সম্প্রতি রাজধানীতে চিকুনগুনিয়া মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩৮ জন রোগী। যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসের থেকে অনেক বেশি। এই তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতালগুলো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ্‌ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট থেকে ডেঙ্গুজ্বরের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। তারা জানায়, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। তাই এই সময়টিকে ডেঙ্গুজ্বরের মৌসুম ধরা হয়। (সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়, ১৬ জুলাই ২০১৭)। কিন্তু এবার জানুয়ারিতে আগাম বৃষ্টি হওয়ায় মশার উপদ্রব বাড়ে আগ থেকেই। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমায় সেখানেই বংশ বিচ্চার করে এডিস মশা। এই থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে একে প্রতিরোধ করা। এদিকে শ্রীলংকায় চলতি বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন বলে দেশটির সাহায্য সংস্থাগুলো জানায়। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করেছেন তারা। অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতি সামলাতে তিন লাখ ডলার বাজেটের ঘোষণা দিয়েছে রেড ক্রস। খবর : আলজাজিরা (সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়, ২৬ জুলাই ২০১৭)

ডেঙ্গু কি : ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত একটি জ্বর। ভাইরাসজনিত রোগের সাধারণত কোনো প্রতিষেধক নেই। ডেঙ্গু ভাইরাস ফ্লেভিভাইরাস গ্রুপের সদস্য এক ধরনের আর এন ভাইরাস। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে এর মোকাবিলা করা হয়। অন্য ভাইরাল ফিভারের মতো এটিও আপনাআপনিই সেরে যায় ৭ দিনের মধ্যে। তবে হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর ভয়াবহ হতে পারে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্থান : ডেঙ্গুর ভাইরাস সাধারণত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অধিকমাত্রায় সংক্রমণ হতে দেখা যায় এবং বাচ্চারাই মূলতঃ এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগের বাহক এডিস এজিপটাই ও এডিস এলবোপিকটাস এই দুই প্রজাতির স্ত্রী মশা বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগ ছড়ায়। এই মশা রাতের বেলা মানুষকে কামড়ায় না বরং দিনের বেলাতেই ডেঙ্গুবাহিত মশা মানুষকে কামড়ায়।

ডেঙ্গু চেনার উপায় : ডেঙ্গু মশা দেখতে নিলাভ কালো। দেহে সাদা জেরা কাটা দাগ আছে। সাধারণত সমুদ্র হতে ১০০০ মিটার ওপরে ভারতে ২১২১ মিটার উচ্চতা ও কলম্বিয়ায় ২২০০ মিটার উচ্চতায় ডেঙ্গু মশা পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৯৬ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বে ২০ মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয় এবং ২৪০০০ হাজার লোক এতে মারা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

* শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে ১০৪ ডিগ্রি হতে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।

* গলা ব্যথা, চরম অবসন্নতা এবং বিষাদগ্রস্ততা দেখা দিতে পারে।

* অরুচি, বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে। লীম্ফগ্ল্যান্ড ফুলে যাবে।

* রোগীর চোখ লাল হতে পারে এবং ত্বকও লাল হতে পারে।

* জ্বর ৩৭ দিন স্থায়ী হয়।

* শরীরের চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয়।

* সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার ৩৪ দিন পর থেকে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণজনিত উপসর্গ দেখা যায় ত্বকে।

রোগ শনাক্তকরণ : রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্তকরণ এবং রক্তের অন্যান্য কিছু পরিবর্তন শনাক্তকরণের মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে। যেমন : সিবিসি, পিসিআর, এলজিজি, এলজিএম এবং ইলিজা পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা হয়ে থাকে। পরীক্ষা ছাড়াও রোগ চেনা সহজ। যদি অন্য জ্বরের সঙ্গে গুলিয়ে যায় তাও বেশি অসুবিধে নেই। কারণ ভাইরাসজনিত জ্বরগুলোর চিকিৎসা প্রায় একই ধরনের।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা : উপসর্গ অনুযায়ী ডেঙ্গুর চিকিৎসা করা হয়। বেশিরভাগ ডেঙ্গু জ্বরই সাতদিনের মধ্যে সেরে যায়, অধিকাংশই মারাত্মক হয়। প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে পানি, বিশ্রাম এবং প্রচুর তরল খাবার। সঙ্গে জ্বর কমানোর জন্য লক্ষণভেদে ওষুধ দিতে হবে। সাধারণ ডেঙ্গুর চিকিৎসা এটা তবে ব্যথানাশক হিসেবে এলোপ্যাথিক এসপিরিন বা ক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ দেয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে। হেমোরেজিক বা রক্তক্ষয়ী ডেঙ্গু (যা খুবই কম হয়ে থাকে) বেশি মারাত্মক। এতে মৃত্যুও হতে পারে। জ্বর, সঙ্গে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখামাত্র হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ শীত অবস্থায় এবং রোগীর যখন অত্যন্ত শীতভাব থাকে তখন গরম চাদর বা কম্বল গায়ে দিতে হবে। গরম জল বা অন্যকোন গরম পানীয় পান করতে দিলে শীঘ্রই শীতভাব কমে যাবে এবং রোগী উপশমবোধ করবে। অত্যন্ত ঘাম হতে থাকলে গরম জলে সামান্য রেকটিফাইড স্পিরিট মিশিয়ে গা ভাল করে মুছে দিলে ঘাম নির্ধারণ এবং শরীরের বেদনার হ্রাস হবে। পিপাসা দূর করার জন্য গরমজল ঠাণ্ডা করে বেশি বেশি পান করতে দেয়া উচিত। হিম, ঠাণ্ডা, আর্দ্র বাতাস লাগান উচিত নয়।

পথ্য : জ্বর অবস্থায় হালকা পথ্য দিতে হবে। বার্লি, ফলের রস, হরলিকস, দুধ প্রভৃতি চলবে। রোগী আরোগ্য লাভ করলে তাজা মাছের ঝোল, মুগের ডাল এবং সরুচালের ভাত পথ্য হিসেবে দিবে। মুখের রুচি ও দুর্বলতা কাটার জন্য ভিটামিন জাতীয় খাদ্য ও ওষুধ বিশেষ উপকারী।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা : ডেঙ্গু মশা, মানে এডিস মশা। সকালসন্ধ্যা কামড়ায়। অর্থাৎ ভোরে সূর্যোদয়ের আধাঘন্টার মধ্যে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আধাঘন্টা আগে এডিস মশা কামড়াতে পছন্দ করে। সুতরাং এই দুই সময়ে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকতে হবে। সেই সঙ্গে এডিস মশা নির্মূল করে ডেঙ্গুকে প্রতিহত করা যায়। যেসব স্থানে এডিস মশা বাস করে সেই সব স্থানের এডিস মশার আবাস ধ্বংস করে দিতে হবে। তাই দিনের বেলা ঘরে যাতে মশা ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। জমে থাকা পানিতে এরা বংশ বিস্তার করে। ফুলের টব, কৃত্রিম পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, গাছের কোঠর, বাঁশের গোড়ার কোঠর, ডাবের খোসা, বাসার ছাদ প্রভৃতি স্থানে জমে থাকা পানিতে এদের বংশ বিস্তার ঘটে বলে সেখানেই মশা নিধক ওষুধ ছিটিয়ে দিতে হবে। বাড়ির আশপাশের নর্দমা ও আবদ্ধ জলাশয়ে ওষুধ ছিটিয়ে মশা মারতে হবে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং মশা ধ্বংসের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই দিনে ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করুন এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।

জটিল উপসর্গ বা পরিণতি : কেন ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভারে হয়ে থাকে তার সঠিক কারণ এখনও নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও ডেঙ্গুর অস্বাভাবিক স্তর বিন্যাসকেই অদ্যবধি স্বতঃসিদ্ধ কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরের ছোট ছোট রক্ত সঞ্চালন নালীগুলোর প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে এবং তাদের পানি নিঃসরণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এতে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়, রক্তের পরিমাণ হ্রাস পায়। লিভার কোষের পচন ধরতে পারে। কিডনীতে প্রদাহ হতে পারে। অস্থি মজ্জায় রক্ত কণিকা তৈরিতে প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ডেঙ্গুজ্বর নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে লক্ষণভিত্তিক কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। যথা– () একোনাইট ন্যাপ, () বেলেডোনা, () জেলসিমিয়াম, () ব্রায়োনিয়া, () রাসটক্স, () রাসভেনিনেনেটা, () পালসেটিলা, () আর্সেনিক, () কলচিকাম, (১০) ইউপেটোরিয়াম পার্ফোলিয়েটাম, (১১) এরোমেটিকাম, (১২) পারপিউরিয়াম, (১৩) চায়না উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

LEAVE A REPLY