আজাদী প্রতিবেদন

বরিষ ধারা মাঝে শান্তির বারি উপভোগের ইচ্ছে, সময়, সুযোগ আজ আর নেই। বিশেষ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ‘খোঁড়াখুড়ি’ আর ‘উন্নয়নের মহোৎসব’ চলতে থাকা চট্টগ্রাম নগরীতে বৃষ্টি মানেই জলজট আর যানজট মিলে মানুষের জন্য তীব্র এক সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি। বছরের পর বছর ধরে তা চলছে, প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতির মাঝে দূরত্ব ত্রমাগত বাড়ছে। এ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের মতো করে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ ভাবনাটা অনেকটাই যেন রঙ মেখে সঙ সাজার মতোই হাস্যকর। বৃষ্টি হলেই নগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে, রাস্তা পানিতে ডুবে যাবে, রাস্তায় স্থানে স্থানে বড় বড় গর্তে গাড়ি উল্টে আহত হবে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গাড়ি, পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলবে গৃহস্থালীর কাজ কিংবা ব্যবসাকেন্দ্র পরিচালনা, কোন স্থানে অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ প্রশাসনকে অপেক্ষায় থাকতে হবে, কোমড় পানি কখন কমবে। সব মিলে বর্ষার কাব্যিকতা তল্পিতল্পা গুটিয়ে উধাও হয়েছে। এখন বর্ষা এলেই নগরবাসী তাকে সাদরে অভ্যর্থনা না জানিয়ে শাপশাপান্ত করতে থাকে। তবে এ কথা মানতেই হবে প্রকৃতির কারণেই শুধু নয়, মানুষসৃষ্ট কারণে দুর্ভোগ বাড়ছে আরো বেশি।

নগরবাসীর নিত্য দুর্ভোগের দায় কি বৃষ্টির? আষাঢ় মাসে বৃষ্টিতো হবেই। বৃষ্টি হবে শ্রাবণ এমনকি ভাদ্র মাস পর্যন্ত। এ দায় তবে কার? প্রায়শঃ শোনা যায় বদলে গেছে এবং বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। বদল অবশ্য হচ্ছে। চট্টগ্রামকে এখন প্রাকৃতিক সুষমা মণ্ডিত প্রাচ্যের রাণী বলা যায় না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর উন্নয়নের নামে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীন কার্যক্রম প্রিয় চট্টগ্রামকে ধীরে ধীরে বাসের অযোগ্য করে তুলছে। বর্ষা মৌসুমে নগরীর প্রধানতম সমস্যা জলাবদ্ধতা। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২০ বছর আগে পাঁচ পর্বের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। সেই প্ল্যানের প্রথম ধাপটি শেষ হয়েছে, বাকি ৪ ধাপের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই।

চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। নির্মাণকাজ চলমান থাকায় ফ্লাইওভারের নিচে খানাখন্দে পরিণত হওয়া রাস্তাগুলোর সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেই। রাস্তার মধ্যবর্তী স্থানে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ নেই। থাকলেও তা ময়লাআবর্জনায় পূর্ণ এবং সঠিকভাবে সেগুলো পানি চলাচলের জন্য সবসময় উন্মুক্ত না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই শহরে হাঁটু পানি, কখনো কোমর পানি আবার কখনো গলা অবধি পানিতে ভরে যায়। জলাবদ্ধতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অধিক বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের আতঙ্কতো আছেই। নগরীতে দফায় দফায় পাহাড় ধসে অনেক মানুষ প্রাণ হারালেও আজ অবধি পাহাড়ের কোলঘেঁষে মানুষের বসতিগুলোকে নিরাপদ করা যায়নি কিংবা তাদের নিরাপদ কোথায় সরিয়ে নেয়া হয়নি। প্রতিবার বর্ষা মৌসুমে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে কিংবা লোক পাঠিয়ে তাদের সতর্ক থাকার কথা বলা হলেও জীবিকার তাগিদে বাস করা এই মানুষগুলো প্রতিমুহূর্তে বেঁচে আছেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র নির্বাচনের আগে নগরীর মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যাগুলো ১ বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব বলে দাবি করেছিলেন। বাস্তবতা উপলব্ধি করে বর্তমানে তিনি বলেছেন তার একার পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার পেছনে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, পিডিবি, এলজিআরডি, সিডিএ, গ্যাস, রাজনীতিবিদগণ এমনকি দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষপ্রত্যেকের দায় রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাগুলোও যদি সমন্বিত ভাবে কাজ করতো তবে দুর্ভোগ অনেকাংশে হ্রাস পেত বলে দীর্ঘদিন ধরে মত দিয়ে আসছেন পরিকল্পনাবিদগণ। তা না হওয়ায় এখন যে যার মতো কাজ করে চলেছে। নিজেদের কাজ করছে এবং কাজ শেষ করে রাস্তাঘাট সংস্কারবিহীন রেখে দেয়া হচ্ছে। দেখা যায় অনেক সময় নিয়ে কোনো সড়কে কাজ হলো বা সম্প্রসারিত হলো এবং এর ফলে মানুষের মধ্যে একধরনের স্বস্তি আসল আবার পরক্ষণেই অন্য কোন সংস্থা তাদের কাজে সেই সড়ক খুঁড়াখুঁড়ি শুরু করল। সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যত্রতত্র ময়লাআবর্জনা এবং পলিথিন ফেলে দেয়ার ফলে নালা নর্দমা, খাল আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে থাকে, এর ফলে পানি ঠিকমতো যেতে পারে না, যা জলাবদ্ধতার অপর কারণ। বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি সাম্প্রতিককালের বৃষ্টিজোয়ারের জলাবদ্ধতায় নগরীর রাস্তাঘাটের যে বেহাল দশা হয়েছে তা একমাত্র ভুক্তভোগী যারা তারাই বুঝতে পারবেন। নগরীর প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বহদ্দারহাট থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক, আরাকান সড়ক, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বায়েজিদ বোস্তামী সড়কসহ নগরীর হেন কোনো এলাকার সড়ক নেই যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বেশ কিছু সড়কে ইট ও বিটুমিন উঠে গেছে। এসব সড়কের কোথাও পিচ নেই, কোথাও সরে গেছে ইট। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোটবড় গর্তের। ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন চলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। এ ছাড়া আগ্রাবাদ বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে ইপিজেড হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও বেহাল। সিডিএ’র উড়াল সড়কের র‌্যাম্পের নির্মাণকাজের জন্য বহদ্দারহাট মোড় থেকে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা পর্যন্ত সড়ক, মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কারণে সড়কটির অবস্থাও বেহাল। এ ছাড়া অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত হাটহাজারী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। তবে এটি ঠিক, ওয়াসা, টিএন্ডটি, গ্যাস কর্তৃপক্ষ বা অন্য কেউ সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন সড়ক খুঁড়ে কাজ শুরুর আগেই তা মেরামতের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সিটি কর্পোরেশনকে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু এরপর সেসব খোঁড়াখুঁড়ির জায়গাগুলোর মেরামতের দায়িত্ব থাকে সিটি কর্পোরেশনের ওপর।

এদিকে নগরজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খোঁড়াখুঁড়ি, বৃষ্টি ও জোয়ারে পানিতে জলাবদ্ধতায় নগরীর রাস্তাঘাটে বিশাল বিশাল খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। আর বৃষ্টির পানিতে যখন এসব ভাঙা রাস্তা পানির নিচে থাকে তখন কত যে দুর্ঘটনা ঘটে তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। এই ভাঙা রাস্তার জন্য অনেক গাড়ি নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তই শুধু নয় নগরীর ভেতরেও অনেক জায়গায় যেতে চায় না। গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রীদের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের যেমন দুর্ভোগ বাড়ছে তেমনি অভিভাবকদেরও দুর্ভোগের শেষ নেই। নগরীই শুধু নয় নগরী থেকে বের হয়ে উপজেলা বা অন্য জেলাগুলোতে যাওয়ার জন্য যেসব সড়কগুলো রয়েছে সেগুলোরও চরম বেহাল দশা।

গত শুক্রবার সকাল থেকে থেমে থেমে কখনও ভারি কখনও মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে চট্টগ্রামে। তবে গতকাল ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর বেশকিছু এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ওইসব এলাকার বাসিন্দারা নানা দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে চাক্তাইখাতুনগঞ্জ, চান্দগাঁও, মোহরা, বাকলিয়া, হালিশহর, আগ্রাবাদ, ছোটপুল, বেপারিপাড়া, গোসাইলডাঙ্গা, পতেঙ্গা এলাকাসহ যেসব এলাকায় পানি ওঠে সেই সব এলাকা পুনরায় প্রভাবে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষকে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। চট্টগ্রামের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃষ্টি পড়তে পারে আরও বেশ কয়েকদিন। আবহাওয়া অফিসের ডিউটি অ্যাসিট্যান্ট সৈয়দা মিলি পারভিন আজাদীকে বলেন, মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এ অব্‌স্থা আরও চার থেকে পাঁচদিন চলতে পারে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ২২০ দশমিক ৪ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আগ্রাবাদ ব্যাংক কলোনি স্কুলের সামনে অপেক্ষমান এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুলতানা নিগার আজাদীকে বলেন, আষাঢ় শ্রাবন মাসে বৃষ্টি হবে, এটা প্রকৃতির বিধান। কিন্তু চট্টগ্রাম, ঢাকাএসব শহরে বসে বর্ষা উপভোগের কথা চিন্তা করাটাই বোকামি। বাসা তার সিডিএ আবাসিক। বললেন, মেয়েকে নিয়ে এখন আবার পানি মাড়িয়ে বাসায় ফিরতে হবে। এটা একদিনের হলে কথা ছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আগ্রাবাদ কর্ণফুলী মার্কেটে ইলিশ মাছ বিক্রেতার সাথে দরাদরি করছিলেন আগ্রাবাদে একটি বেসরকারি ব্যাংকের জুনিয়র কর্মকর্তা আসিফ মহিউদ্দিন। পুরোপুরি ভিজে গেছেন তিনি। বাসা লালখান বাজার। আগে থেকে পরিচয়ের সুবাদে হাসলেন। বললেন, এই বৃষ্টিতে একবার বাসায় ঢুকলে আর বেরুতে মন চাইবে না। তাই বাজারটাও করে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি বললেন, এই জলাবদ্ধতার মধ্যে ফুটপাত দিয়ে চলাচল খুব বিপদ। কারণ কোথায় ্যাব আছে, কোথায় নেই তা বুঝার উপায় নেই। তাই রাস্তা দিয়েই চলতে হয়। ছুটে চলা গাড়ির পানি গায়ে এসে পড়ছে কিংবা রাস্তায় গর্তে হোঁচট খেয়ে রক্তাক্ত হতে হচ্ছে, তবু সেটাই ভালো।

সীমা নামে এক নারী বলেন, কিছু রাস্তা দেখা যায় ভালো, কিন্তু প্রয়োজনের কথা বলে সেই ভালো রাস্তা খুঁড়ে নষ্ট করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর খুঁড়ে রাখা জায়গা কোনোমতে ভরাট করা হলেও রাস্তাটা ঠিক করা হয় না এবং ওই জায়গাগুলো উঁচু করে রাখা হয়। বর্ষা শুরুর আগে আগে এমন দায়সারা সংস্কার কাজের কারণে পথচারীদের ভোগান্তি আরও বাড়ে। তিনি আরও বলেন, নগরীতে কোন রাস্তায় পানি জমে না সেটা বলাটা এখন মুশকিল। কিন্তু নৌকা নামানো হলেও সেটি নিয়ে মেয়র বা সরকার চুপ। তাই আমরাও চুপ করেই এসব সহ্য করছি।

LEAVE A REPLY