আজাদী প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নে যে তিন মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন সেই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ৫০ বছর এগিয়ে যাবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতামুক্ত হবে বন্দর নগরী। গতকাল শনিবার নগরীর জিইসি মোড়ের ওয়েলপার্ক রেসিডেন্সে সম্প্রতি একনেকে সিডিএর অনুমোদিত জলাবদ্ধতা নিরসনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম অভিভাবকহীন নয়, প্রধানমন্ত্রীই চট্টগ্রামের অভিভাবক। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায়

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার প্রকল্প, নগরীর লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প এবং কর্ণফুলী তীরবর্তী কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার সড়ক কাম বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে বলে জানান আবদুচ ছালাম। তিনি বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সহায়তা লাগবে। মেয়র মহোদয়কে সম্পৃক্ত করেই এ মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া হবে। তাঁর সহায়তা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে ওয়াসার এমডির সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এরইমধ্যে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে নগরীতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবো। প্রকল্প অনুমোদনের পর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান সিডিএ চেয়ারম্যান।

আগামী ৫ বছরের মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের তথ্য তুলে ধরে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, চট্টগ্রামকর্ণফুলীর পাড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে ঘিরে সরকারের উন্নয়ন উৎসব চলছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে এবং অনেক প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। বিশাল সম্ভাবনার ইকোনমিক জোন, শিল্প পার্ক, পর্যটনশিল্প, এশিয়ান হাইওয়ে প্রকল্প, ডিপ সী পোর্ট, বিদ্যুৎপল্লীসহ অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে দক্ষিণ চট্টগ্রামে। ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে সেটি দক্ষিণ চট্টগ্রামকে বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ ৩০ মিনিটে শাহ আমানত ব্রিজ থেকে আগ্রাবাদ যেতে পারবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামকে বন্দরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করতে না পারলে এ বিশাল সম্ভাবনা কোন কাজে আসবে না।

মতবিনিময় সভায় আবদুচ ছালাম বলেন, কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু থেকে বাকলিয়াবহদ্দারহাট পর্যন্ত রোডের কাজ চলছে। বহদ্দারহাট জংশনের ওভারপাস আগে থেকে কমপ্লিট করা আছে। মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার ফ্লাইওভার প্রায় কমপ্লিটের পথে। সেটি যান চলাচলের জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। ষোলশহর দুই নম্বর গেইট মোড়ে র‌্যাম্প ও ল্যুপ নির্মাণ শেষ হলেই কমপ্লিট ফ্লাইওভার চালু হবে বলে জানান সিডিএ চেয়ারম্যান। তিনি জানান, দুই নম্বর গেইট ও জিইসি মোড়ে র‌্যাম্প ও ল্যুপসহ ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। জিইসি মোড়ের চারটি র‌্যাম্প ছাড়া এটি চলাচলের জন্য চালু করা হবে। পুরোপুরি চালু হলে জিইসি মোড়ের কাজ শুরু হবে। গত ১৬ জুন ফ্লাইওভারটির একটি লেইন পরীক্ষামূলকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তবে বাস্তবে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় পরের বছরের মার্চে। শুরুতে এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৪৬২ কোটি টাকা। পরে র‌্যাম্প ও লুপ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয় ৬৯৮ কোটি টাকা। সেই সাথে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।

নগরীর ওআর নিজাম রোডে হোটেল ওয়েল পার্কে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় সিডিএ চেয়ারম্যান ছালাম বলেন, লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হবে আগামী অক্টোবর থেকে। লালখানবাজার থেকে ফ্লাইওভারটি যখন বন্দরের পাশ দিয়ে বিমানবন্দর চলে আসবে, তখন চট্টগ্রামের মানুষ এর সুফল ভোগ করবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েরটিতে টাইগার পাস, আগ্রাবাদ, বারিক বিল্ডিং, কাস্টমস মোড়, ইপিজেড, কেইপিজেড, কাঠগড়, সী বিচ এলাকায় গাড়ি ওঠা নামার ব্যবস্থা থাকবে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা ও যানজটমুক্ত, শিল্পবান্ধব নগরে পরিণত হবে জানিয়ে আবদুচ ছালাম বলেন, আট বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নগর উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে আমি অবিচল ছিলাম। আমার যোগ্যতা ও মেধার পুরোটাই একাজে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। চলমান তিনটি মেগা প্রকল্পের আওতায় ২৮টি খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর (জোয়ার প্রতিরোধক) স্থাপন করা হবে। প্রকল্প শেষ হলে জোয়ারের পানি ঢুকে আগ্রাবাদ ও হালিশহরে আর জলাবদ্ধতা হবে না। জোয়ারের পানিতে নষ্ট হবে না চাক্তাইয়ের পণ্যও। জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিক পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

ফৌজদারহাটবায়েজিদ বাইপাস সড়কের ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে ফৌজদারহাটবায়েজিদ বাইপাস সড়ক চালু হবে। এটি চালু হলে চট্টগ্রামের যানজট অর্ধেকে নেমে আসবে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিংরোডের কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে আউটার রিংরোডের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। এখানে লোকজনের জন্য ৫ কিলোমিটারজুড়ে বিনোদন স্পট গড়ে তোলা হবে। আগামী ৫ বছর পর প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তর হবে চট্টগ্রাম।

মতবিনিময় সভায় সিডিএ চেয়ারম্যানের সাথে আরো উপস্থিত ছিলেন, সিডিএর বোর্ড সদস্য জসীম উদ্দিন, কেবিএম শাহজাহান, জসীম উদ্দিন শাহ, সিডিএর নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, উপসচিব অমল গুহ, স্থপতি সোহেল সাকুর প্রমুখ।

LEAVE A REPLY