ঢাকা ব্যুরো

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ থেমে নেই। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশের পর থেকে তা নিয়ে বাদপ্রতিবাদ চলছে। রায় প্রকাশের পর সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ সরকার দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা আদালতের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সিনিয়র মন্ত্রীরাও আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, এতে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এই রায় অনভিপ্রেত। অন্যদিকে বিএনপি এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করেছে। প্রধান দুইদলের সিনিয়র নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মাঝে এবার পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়েছে আইনজীবীদের দু’গ্রুপ। রায় নিয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে অপসারণ ও তার গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। সেই সঙ্গে ওই রায় নিয়ে মন্ত্রীদের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট শিগগিরই প্রকাশের দাবিতে আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার তিন দিনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। শুক্রবার ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের এই কর্মসূচি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরাও গতকাল কর্মসূচি দিয়েছে। রায়ের প্রতিবাদে ১৩, ১৬ ও ১৭ আগস্ট দুপুর ১টায় সারা দেশের আইনজীবী সমিতিগুলোতে প্রতিবাদ সমাবেশ পালনের ডাক দিয়েছে তারা। রায়ে সং ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ। এর আগে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সংসদ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যেসব মন্তব্য করেন তার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা এতকাল জেনে এসেছি, দিস ইজ পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, কিন্তু এ রায়ের পরে মনে হচ্ছে, উই আর নো লংগার ইন দি পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। উই আর রাদার ইন জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ।’ সংসদ সদস্যদের নিয়ে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণকে তিনি ‘অপরিপক্বতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

খায়রুল হকের এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে এসে বৃহষ্পতিবার তুমুল হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করলে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আওয়ামী সমর্থকরা এর প্রতিবাদে চিৎকার শুরু করেন। এই উত্তেজনার মধ্যে সংবাদ সম্মেলন শেষ করে বিএনপিপন্থিরা চলে যাওয়ার পর সমিতির সহসভাপতি আওয়ামীপন্থি আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট ওজিউল্লাহ দাবি করেন, জয়নুল আবেদীনের বক্তব্য তার নিজের, সমিতির নয়।

এদিকে গতকাল ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে প্রধান বিচারপতি যেসব অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য এবং পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা দেশের আইনজীবী সমাজকে সং ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত করেছে। ‘রায়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংসদ এবং অধস্তন আদালতের প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সংগঠনের সদস্য সচিব শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে একটি দল ও মহল বিচারাঙ্গনকে ‘বিতর্কিত করার পাঁয়তারা’ করছে। ‘আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে দেশবাসী দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেন। বঙ্গবন্ধুকে ইঙ্গিত করে তিনি যে বক্তব্য লিখেছেন তাতে আইনজীবীসহ সারাদেশের মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। বিষয়টি আমাদের পবিত্র সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ও মীমাংসিত।’ তিনি জাতীয় সংসদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। সংসদকে হেয় করা মানেই গণতন্ত্রকে হেয় করা, জনগণকে হেয় করা। আমরা আইনজীবী অঙ্গন এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।। রায়ে যে সমস্ত ‘আপত্তিকর, অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক, অপ্রাসঙ্গিক’ পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সেগুলো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রতিক্রিয়াকে সমর্থনও জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ নেতৃবৃন্দ।

LEAVE A REPLY