সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশের ৫২ কিলোমিটারের মধ্যে ৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সড়কের পার্শ্বে। আর এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৪৫হাজার শিক্ষার্থী মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন মহাসড়ক পারাপার হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে গিয়ে গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে সাত শিক্ষার্থীর। আহত হয়েছেন আরো ২৬ শিক্ষার্থী। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই বাঁশবাড়িয়া স্কুলের ৭ম শ্রেণীর ইংরেজি ১ম পত্রের পরীক্ষা শেষে জাহেদুল ইসলাম জুনায়েদ বাড়ি ফেরার জন্য মহাসড়ক পারাপারের সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায়। আগে মহাসড়কটি দুই লাইনের ছিল। এখন প্রায় দ্বিগুণের সমান চারলেনে সম্প্রসারিত হয়েছে। চারলেনে গাড়ি চলাচল শুরু হলে ফুট ওভারব্রিজ ছাড়া এ কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কিভাবে বিদ্যালয়ে যাবে এনিয়ে অভিভাবকরা ছিল দুঃশ্চিন্তায়। এজন্য তারা মহাসড়কের পাশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের পারাপারের সুবিধার্থে ফুট ওভারব্রিজ নির্মানের দাবি জানিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ফুট ওভার ব্রীজের দাবিতে মানববন্ধনও করেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা। প্রশাসন এব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও এখনও পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের পাশে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৩টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৮টি মাদ্রাসা এবং তিনটি কলেজ। এছাড়া রয়েছে এনজিও পরিচালিত ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩/৪টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের জন্য নিজেদের অর্থায়নে একজন কর্মচারী রেখেছেন। কিন্তু অভিভাবকদের অভিযোগ, সেই দায়িত্ব তারা ঠিকমত পালন করেন না। স্কুল ছুটির পর কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিজেরাই রাস্তা পারাপার করে। এতে যে কোন সময় দুঘর্টনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমেনা বিদ্যানিকেতনের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাইদুর রহমান শাহিন জানান, সন্তান বিদ্যালয়ে পাঠাতে গিয়ে সার্বক্ষণিক টেনশনে থাকতে হয়। তার মধ্যে আগে ছিল দুই লেন, এখন চার লেন হওয়ায় আরো বেশি দুঃচিন্তায় থাকতে হয়। এব্যাপারে তড়িৎ প্রদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

হযরত খাজা কালুশাহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. অলি আলম চৌধুরী বলেন, তার স্কুলের সামনে ফৌজদারহাট ওভারব্রিজ থেকে গাড়ি নামার সময় দারোয়ান সংকেত দিলেও সড়ক ঢালু হওয়ায় ইচ্ছে থাকলেও চালকরা গাড়ি থামাতে পারেন না। তাই এ অংশে আন্ডারপাস নির্মানের দাবি করে আসছিলেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

বাঁশবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও বাঁশবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর জানান, বাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে ৬০০ মিটারের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫টি। এই অংশে কমপক্ষে দুটি ফুট ওভারব্রিজ প্রযোজন।

দেখা গেছে, কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দারোয়ান কিংবা অফিস সহকারী লাল পতাকা হাতে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছেন। আর শিক্ষার্থীরা তখন দল বেধে রাস্তা পার হচ্ছেন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিপদজনকভাবে মহাসড়ক পার হচ্ছে।

ফৌজদারহাট কে এম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭০০জন। পাশের দুটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজারের মতো। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য ফৌজদারহাট বাজার এলাকায় জরুরি ভিক্তিতে ফুট ওভারব্রিজ প্রয়োজন।

বাঁশবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইসহাক দৈনিক আজাদীকে জানান, তাঁর বিদ্যালয়ের সাথে লাগোয়া প্রাথমিক স্কুলে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে। এদের অনেকেই এখন কঁচিকাচা বয়সের। ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক পূর্ব ও পশ্চিমের অংশ মিলিয়ে চারলেন। এই চারলেনে হাজার হাজার গাড়ি চলছে প্রতিনিয়ত। ছোট শিশুদের জন্য এই পথ পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমরা বারবার ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। এতে আমরা যে আশংকা করছিলাম সেটাই সত্যি হলো। সম্প্রতি আমার স্কুলের ৭ম শ্রেণীর এক ছাত্রকে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রাণ দিতে হলো। ওভার ব্রিজ নির্মাণ না হলে আগামী দিনে আরো কি অপেক্ষা করছে তা কেউ জানে না।

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কায়ুম আলী সর্দার জানান, এই মহাসড়কের প্রতি মিনিটে ৭০টির মতো গাড়ি চলাচল করে। ফুট ওভারব্রিজ বাড়ালে দুর্ঘটনা কমে যাবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর জানান, মহাসড়কে পাশে অবস্থিত সবকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ফুট ওভার ব্রিজ প্রয়োজন। এর জন্য তারা সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে দাবিও জানিয়েছে।

এব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের(সওজ) প্রকল্প নির্বাহী জুলফিকার আহমেদ দৈনিক আজাদীকে জানান, সম্প্রসারিত চার লেনের প্রকল্পের একটিসহ আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। এই প্রকল্পে ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৫টি ফুট ওভারব্রিজ থাকবে। অগ্রাধিকার ভিক্তিতে পর্যায়ক্রমে তা নির্মাণ করা হবে।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম ভুঁইয়া দৈনিক আজাদীকে জানান, ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কের পাশে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা রাস্তা পারাপার হতে গিয়েও দুর্ঘটনায় পড়ছে। মহাসড়কের পাশে ওভারপাস নির্মাণ করার বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY