দেশে মানসম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকের অভাব ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি থেকে শুরু করে অনেক বিষয়ে পাঠদানের মতো দক্ষ শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে এস এস সি ও এইচ এস সি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী ভাল ফল দূরে থাকুক, পাস পর্যন্ত করতে পারছে না। ভাবনার বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীর ভিত্তি দুর্বল থেকে যাওয়ায় উচ্চ শিক্ষায় তার প্রভাব পড়ছে। গত মঙ্গলবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত বিষয়ে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের ৮৬ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ কোন দক্ষতা নেই। এঁদের বড় অংশেরই গণিত বিষয়ে পড়াশুনা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত। বাকিরা গণিত ডিগ্রি পর্যায়ে পড়লেও তা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পড়েছেন। শিক্ষকতা শুরু করার পর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও নেই অনেকের। ফলে, দক্ষ শিক্ষকের অভাবে গণিত শিক্ষার্থীদের ভালো ভিত গড়ে উঠছে না। একই কথা ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অথচ এসব বিষয়ে শক্ত ভিত গড়ে না উঠলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি ব্যাহত হবে।

দেশে মান সম্পন্ন যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত শতক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল, এখন সে সুনাম ধরে রাখা যায়নি। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বেড়েছে। তবে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে বোঝায় প্রধানত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রাপ্ত অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর। দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা না গেলে মানসম্পন্ন শিক্ষার্থীও তৈরি হবে না। যার প্রভাব পড়ে পরীক্ষার ফলে। মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাথমিক শিক্ষা মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নতুন পৃথিবীর সন্ধান পায়। তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা জগৎ। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে বোঝাপড়ার পর্ব অনেকটাই সম্পন্ন হয় মাধ্যমিক স্তরে। এ স্তরে মানসম্পন্ন শিক্ষা না পেলে তার ঘাটতি সারা জীবনই টানতে হয় তাদের। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে প্রায় ৩০ শতাংশ অপ্রশিক্ষিত দিয়ে। এটা উদ্বেগের বিষয়।

মাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্র। এখানেই একজন শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান তৈরি হয়। ফলে এখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিতেই হবে। কোন শিক্ষক কোন বিষয়ে পাঠদান করবেন, সাধারণত তা নির্ধারণ করে দেন প্রধান শিক্ষক। গণিতের ডিগ্রিধারীদের গণিতের পাঠদান, ইংরেজির ডিগ্রিধারীদের ইংরেজির পাঠদান এবং এভাবে যাঁর যে বিষয়ে ডিগ্রি আছে সেভাবেই তাঁকে দিয়ে পাঠদান করার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদারকি ও নিয়ম প্রণয়নের মাধ্যমে এর মান বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে পারে। একই সাথে নিয়মিত বিরতিতে তাঁদের পাঠদানের দক্ষতাও বাড়িয়ে তুলতে হবে। আশা করি শিক্ষক নিয়োগের নিয়মাবলী নির্দিষ্ট করে সরকার দ্রুতই গাইড লাইন প্রণয়ন করবে এবং এটি বাস্তবায়নেও কঠোর নজরদারিও রাখবে। দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ায় আর্থিক সংকটের কারণে পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে না। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারিবেসরকারি সব শিক্ষকের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সরকারেরই দায়িত্ব। মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্রশিক্ষকের অনুপাতের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আবার শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিক পর্যায়ে। বিদ্যমান এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান আরো বাড়ানো উচিত। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠেছে। এ জন্য শিক্ষকদেরও প্রযুক্তিবান্ধব হিসেবে প্রশিক্ষিত করে তোলা দরকার। নীতি নির্ধারকদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার শতভাগ মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। বিদ্যালয় পরিচালনায় দায়সারা গোছের কমিটি নয়, সমাজের দায়িত্বশীল সক্রিয় ব্যক্তিদের এতে সম্পৃক্ত করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও সভার মাধ্যমে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে গতিশীল করে তোলা দরকার। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক কমিটি, ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী কমিটি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যে সমন্বয় করাও একান্ত প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY