তিনি হাসলে কী যেন কী ঘটে যায়, যেন অশুভ যা কিছু উড়ে যায়। রূপালি পর্দার সেই উচ্ছ্বল তরুণীর অভিনয়ে মুগ্ধ হননি এমন দর্শক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

তখন হয়তো ঘরে ঘরে ছিলো তার প্রেমিক। ছিলো তাকে ঈর্ষা করার মতো সাধারণ তরুণীও! মনে রেখেছেন ডান গালের তিলের জন্য বিখ্যাত সেই মেয়েটিকে। অপূর্ব হাসি বা কালো তিল কিংবা সাবলীল অভিনয় যে কারণেই হোক কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার খবর রাখতেন দিতি। এখন তিনি এসবের ওপরে। দেখতে দেখতে দিতিহীন দিনগুলোর বয়স হলো এক বছর! গতকাল ২০ মার্চ ছিল তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। দিতি অভিনীত ছবির একটি গানের কয়েকটি লাইন ‘ওই দুটি চোখ যেন, জলে ফোটা পদ্ম, যতো দেখি তৃষ্ণা মেটে না/ভীরু দুটি বাঁকা ঠোঁটে পূর্ণিমা চাঁদ ওঠে, হাসলেই ঝড়ে পড়ে জোসনা।’ (গায়ক : সুবীর নন্দী, চলচ্চিত্র : উসিলা)। আহা, এ গান যেন শুধু দিতির জন্যই গীত হতে পারে। এই দুঃসাহসে, ভালোবাসার অজুহাতেই কিনা জীবনের সঙ্কট আর অসুস্থতাকে থোড়াই কেয়ার করেছিলেন দুই সন্তানের এই জননী। একই সঙ্গে সংগ্রামী ও আত্মবিশ্বাসী দিতির পরিচয় পাওয়া গিয়েছিলো মধ্যবয়সেও! তাই অপারেশন থিয়েটার বা কেমোথেরাপির ঘরে নেওয়ার আগে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন লাগতো না! সবাইকে বোঝাতেন, নতুন কোনো নাটকসিনেমার শুটিং করছেন! অথবা দিতি যেন চুলখোলা সেই কিশোরী অপারেশন থিয়েটার যার কাছে এক খেলাঘর মাত্র!

ভারতের চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব অর্থোপেডিকস এ্যান্ড ট্রমালজি (এমআইওটি) হাসপাতালে শুয়ে চিত্রনায়িকা দিতি কিছু কথা বলেছিলেন তার সহকর্মী ও ভক্তদের উদ্দেশে। সেই কথাগুলো মেয়ে লামিয়া চৌধুরীর ফেসবুক স্ট্যাটাস হয়ে প্রকাশ পেয়েছিলো গণমাধ্যমে। অপারেশনের কাঁচির নিচে যাওয়ার দু’দিন আগে, ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত দিতি বলেছিলেন, ‘তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে এসে একটা কাচ্চি বিরিয়ানির পার্টি দেবো। মনে হচ্ছে ফাইভ স্টার হোটেলে হলি ডে করতে এসেছি। তোমাদের সাথে ভেরি সুন মজা করতে চলে আসবো ইনশাল্লাহ।’ কী অদ্ভুত রসিকতা! দিতির সেই কথাগুলো কিছুদিনের জন্য হলেও সত্য হয়েছিলো। অসুখ জয় করে দেশে ফিরছিলেন তিনি। দিতি ভক্তদের হয়তো মনে আছে যে, অপারেশনের আগেপরে দিতির সঙ্গে অনেকগুলো ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছিলেন লামিয়া। প্রতিটি ছবিতে দিতিকে হাস্যোজ্জ্বলভাবে দেখা গেছে। মেয়ে লামিয়া ও ছেলে দীপ্তকে জড়িয়ে দুষ্টু হাসি হেসেছেন দিতি। ভেংচিও দিয়েছেন। একটিবারের জন্যও তাকে মন খারাপ করতে দেখা যায়নি, ম্লান হয়নি তার মিষ্টি মুখ। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবন যেন হাসিখেলার অন্য নাম ছিলো দিতির কাছে। কোটি ভক্ত, সহকর্মী ও অনুরাগীর দোয়ায় দিতির মস্তিষ্ক থেকে খুদে টিউমারটি কোথায় যেন উড়ে গিয়েছিলো তার হাসির তরঙ্গের মতো। এরপর অমোঘ নিয়মে ধীরে ধীরে হার মানলেন দিতি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে স্মৃতি ভুলে যাচ্ছিলেন, ছেলেমেয়েকে চিনতে পারছিলেন না। একদিন সব শুন্য হয়ে গেলো। অর্ধযুগ ধরে চলা একটি চলচ্চিত্রের অ্যান্ড টাইটেল উঠলো, ‘সমাপ্তি’। মাত্র ৫০ বছর বয়সে ‘দিতি আর নেই’ হয়ে গেলেন। সত্যি কী ‘নেই’ দিতি? ভক্তদের মনে যেমন, তেমনই ‘শিল্পী হৃদয়ে দিতি’ আছেন। এই শিরোনামে কিংবদন্তি এই শিল্পীকে স্মরণ করা হবে তারই প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে। দিতির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (২০ মার্চ) বাদ আসর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। এখানে উপস্থিত থাকবেন দিতির সহকর্মী, পরিবারের সদস্য ও ভক্তরা। নিজের কাজ দিয়েই বেঁচে থাকবেন দিতি আর নিজের নামের মতোই অর্থবোধক এক জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি। পারভীন মানে সপ্তর্ষিমণ্ডল। সুলতানা মানে তো সম্রাজ্ঞী। অন্যদিকে অভিধান বলছে, ‘দিতি’ শব্দের মানে ‘দেবমাতা’, ‘দক্ষ প্রজাপতির কন্যা’, ‘কাশ্যপমুনির পত্নী’ প্রভৃতি। অন্য দিকে অদিতি শব্দের মানেও একই। কিন্তু অদিতির আরেকটি অর্থ হলো ‘পৃথিবী’। পৃথিবীর মায়া কেইবা ছাড়তে চায়! তাই আমাদের প্রিয় দিতি যেন অদিতি। যে দুটি শব্দের অর্থের তেমন হেরফের হয় না। আর স্মৃতি? স্মৃতি যেন দিতির কথাই বলে।খবর বাংলানিউজ।

LEAVE A REPLY