শৈবাল চৌধূরী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সর্বশেষ চলচ্চিত্র ফাখরুল আরেফিন খান পরিচালিত ‘ভুবন মাঝি’। কুষ্টিয়া অঞ্চলের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি একজন বীরাঙ্গনার ১৯৭১ ও তৎপরবর্তী জীবন কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যে কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত। হাল আমলে এদেশে চাড়া দিয়ে ওঠা উগ্রবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার নেপথ্যে রয়েছে ১৯৭১এর সেই পরাজিত বিপক্ষ, যাদের অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে কলকাঠি নেড়ে চলেছে প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে তাই এই ছবির কাহিনীরেখার প্রধান উপজীব্য। পাশাপাশি ওঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সক্রিয় শক্তির অসহায়তা এবং উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্মের প্রতিরোধের সচেতনতা।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে চিত্রনাট্য রচনা করেছেন পরিচালক ফাখরুল আরেফিন খান। সিনেমা ভেরিতে রীতির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি এক্ষেত্রে। তবে খুব একটা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে পারেন নি অবিন্যস্ততার কারণে। এ কারণে ঘটনা ও চরিত্রগুলো অনেকাংশে বিশ্বস্ততা ও প্রতিষ্ঠা পায় না। কখনো কখনো খাপছাড়া মনে হয়। আকাশ বাণীর দৃশ্যটির কল্পনা ও বিন্যাস সুন্দর। সে তুলনায় অন্যগুলো নিতান্ত সাধারণ। স্বাধীন বাংলা সরকারের শপথ গ্রহণের দৃশ্যটিতে দেখা যায়, নহীর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) একাই হারমোনিয়াম নিয়ে রিহার্সেল করছে। কিন্তু শপথ গ্রহণের সময় শোনানো হয় পুরুষ মহিলা কণ্ঠের কোরাসে জাতীয় সাঙ্গীত। বাস্তবে সেদিন পুরুষ কণ্ঠেই জাতীয় সঙ্গীত গীত হয়েছিল। পরিচালক ও সঙ্গীত পরিচালক উভয়ের সচেতনতা এখানে আবশ্যক ছিল।

এ রকমের অনেক কন্টিনিউটি ব্রেক ছবি জুড়ে রয়েছে। জাতীয় পতাকার বেলায় বিশেষ করে। ছবির কুশলী দিক চমৎকার চিত্রগ্রহণ। অনেক পরিশ্রমী কাজ করেছেন চিত্রগ্রাহক রানা দাশগুপ্ত। লোকেশন নির্বাচনও যথাযথ পার্থ সারথি মোদক ও সাইফুল ফারদিনের সম্পাদনাও ভালো।

তবে ছবির পোশাক পরিকল্পনা ও রূপসজ্জা মানানসই নয়। দৃশ্য বিশেষে উচ্চকিত। বিশেষ করে ফরিদা চরিত্রের (অপর্ণা ঘোষ) পোশাক ও রূপসজ্জা প্রায়শই উচ্চকিত। যেহেতু চরিত্রটি এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা তাই এসব ক্ষেত্রে নজর পড়েছে বেশি। শিল্প নির্দেশকেরও মনোযোগের প্রয়োজন ছিল।

ছবির অভিনয়াংশ উল্লেখযোগ্য নয়। পরমব্রত অত্যন্ত সাদামাটা অভিনয় করেছেন। চরিত্রের সাথে মিশে যাওয়া সম্ভবপর হয় নি। তাছাড়া তার অভিনয় ইদানীং একঘেঁয়ে হয়ে পড়েছে। অপর্ণা ঘোষ ও মাজনুন মিজান অনেক ভালো করেছেন। অন্যরা গড়পড়তা।

ভুবন মাঝির উল্লেখযোগ্য আরেকটি দিক সঙ্গীত। আবহ ও কণ্ঠ উভয় ক্ষেত্রেই সঙ্গীত পরিচালক যথেষ্ট মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ছবিটির প্রদর্শনী চলাকালে ৭ মার্চ সঙ্গীত পরিচালক কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য হুগলিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। অত্যন্ত প্রতিভাবান এই সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের লোকজ সঙ্গীতে ছিল অবিস্মরণীয় দখল। ভুবন মাঝি তাঁর প্রথম ও শেষ সঙ্গীত পরিচালিত চলচ্চিত্র। প্রথম ছবিতেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। কালিকা প্রসাদের অকাল প্রয়াণ প্রকৃতার্থেই একটি শূন্যস্থান তৈরি করেছে।

ভুবন মাঝির ভরকেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একরৈখিক কোনো যুদ্ধ বিশেষ নয়। এই যুদ্ধের অনেক প্রেক্ষাপট ও পরিপ্রেক্ষিত আছে। বহুমাত্রিক এই জনযুদ্ধের অনেক পরিপ্রেক্ষিতের একটি বীরাঙ্গনা অধ্যায়। দুই লক্ষের বেশি নির্যাতিতা নারীর বেশির ভাগই পুনর্বাসিত হননি। অনেকে বাধ্য হয়েছেন আত্ম বিসর্জনে। বাকিরা মিশে গেছেন জনস্রোতে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সরকার এই বীর নারীদের সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছেন। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হবার সাহস জুগিয়েছে তাঁদেরণ্ড সরকারি এই স্বীকৃতি। অনেকেই এখন উন্মোচন করছেন তাঁদের মর্মন্তুদ ইতিহাস। কিন্তু বেশিরভাগই থেকে গেছেন অন্তরালে। অপমান অনাদর অবহেলায় হারিয়ে গেছেন অনেক বীর নারী। কয়েকজন বীর নারীর অসহায়তা দেখার ব্যক্তিগত করুণ অভিজ্ঞতা আমারও আছে।

ফাখরুল আরেফিন খানকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা তিনি মুক্তিযুদ্ধের এই দিকটিকে বেছে নিয়েছেন। বীর নারী ফরিদাকে তিনি সসম্মানে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে দিয়ে তিনি অবশ্যই একটি সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নিজের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর সামাজিক ও শৈল্পিক দায়বদ্ধতার পরিচয় রেখেছেন আন্তরিকতার সাথে। ফরিদার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের এমন একটি অঞ্চলের (কুষ্টিয়া) মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন, এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে অঞ্চলটির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ অঞ্চলের একটি আম্রকাননে এদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেছিলেন। গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার সরকার। এ মাটির কাছে আমাদের অপরিসীম ঋণ।

ফাখরুল আরেফিন খান বাংলাদেশের একজন তরুণ চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চলচ্চিত্র সংসদ চর্চার সঙ্গে সংযুক্ত। প্রথম নির্মাণেই তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বেছে নিয়েছেন তাঁর অগ্রজদের মতো যা অবশ্যই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার দাবিদার।

১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের একটি প্রধান অনুষঙ্গ। এদেশের জন্মের নেপথ্যে এই মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। অন্য দেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক অনেক পার্থক্য আছে। এখানে সরাসরি লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যুদ্ধের মাঝখানে কিংবা শেষে কোনো সমঝোতা বা হিসেব নিকাশের আলোচনার মধ্য দিয়ে কোনো ভাগ বাটোয়ারা অথবা যুদ্ধ বিরতি ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেনি। ঘটেছে প্রচুর রক্তক্ষয়ের পরিবর্তে। মানবতা এখানে আক্ষরিক অর্থেই পদদলিত হয়েছিল। সেযুদ্ধ নিয়ে প্রতিপক্ষ পাকিস্তান এখনো নানারকম বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত।

বিশ্বের ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায়। অপারেশন সার্চলাইট নামের সেই হত্যাকাণ্ডে প্রথম রাতেই হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ঠিক তেমনি একটি ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খুলনার চুকনগরে। মাত্র এক ঘণ্টায় দশ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তারা। এসব মানুষ নিরুপায় হয়ে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দিচ্ছিলেন শরণার্থী হয়ে। কিন্তু পাকিস্তান এসব আজ আর স্বীকার করে না। অবশ্য তাদের অস্বীকারের বিষয়টি অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমাদের উচিত নানাভাবে বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত করা। পাশাপাশি পূর্ব প্রজন্মকেও অবহিত রাখা। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

ভুবন মাঝি সরকারি অনুদান সহায়তায় নির্মিত। এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলা যায়, কেবল অনুদান দিয়ে কাজ সারলে চলবে না, ছবিগুলোর পরিবেশনার ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা পালন করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুদানপ্রাপ্ত ছবিগুলোর প্রমোদকর ও ভ্যাটমুক্ত করে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সারাদেশের সব জেলা ও উপজেলায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ উদ্যোগ নিতে পারে। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়ে এ ধরনের চলচ্চিত্র বাক্সবন্দি হয়ে থাকলে সৎ উদ্দেশ্য সফল হবে না।

LEAVE A REPLY