মোস্তফা কামাল পাশা

নতুন কেনা পাঁচশ হাজার টনী প্রমোদ তরিতে আয়োজিত হয়েছে খানদানি পার্টি। নামে খানদানি হলেও পার্টিটাকে মিক্সপার্টি বলা যায়। এখানে বাদশাহী জমানার রূপার বাহারি হুঁকোর পাশাপাশি আছে পশ্চিমা ঘরানার ডান্স পার্টি। আরবের অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী আস্ত ভেড়ার রোস্টের সাথে বেদুইন নাচের আসর। আছে নানা দেশের বাছাই করা পানীয়র দুর্লভ সংগ্রহ। পশ্চিমাসহ সব ধরনের মধ্যযুগীয় থেকে সর্বশেষ মুখরোচক খাবারের নানা আইটেম।

একজন হাফ রাজনীতিক কাম কর্পোরেট গ্রুপের কর্নধার তাঁর একজন অতি প্রিয় মানুষের সম্মানে নিজস্ব প্রমোদ তরিতে ব্যতিক্রমী পার্টির আয়োজন করেছেন। বাছাই করা শ’দুয়েক মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিরা সমাজের শিরোমনি। দশ কোটি টাকায় কেনা প্রমোদ তরিটিতে বিশেষ পার্টি আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মুম্বাইর একটি নামী ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে। দু’শ জনের পার্টির জন্য এখানে ব্যয় করা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। প্রমোদ তরিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, বাইরে থেকে এর ভিতরের জৌলুস নিয়ে কারো ন্যূনতম ধারণা নেয়ার উপায় নেই। রাত ৮টায় নানা রঙের এক ডজন বেলুন উড়িয়ে সূচনা হয় পার্টির। শেষ হয় ভোর চারটায়। মূল পার্টি বসে ইয়টের চমৎকার সুইমিং পুলকে কেন্দ্র করে। এর বাইরে তিন তলা ইয়টের প্রতি তলাতেই রাখা হয় মনোহর এবং ব্যতিক্রমী সব আয়োজন। আয়োজক এবং তাঁর প্রিয়জনটি মোগল সম্রাটসম্রাজ্ঞির বিশেষ পোশাকে সজ্জিত হয়ে অতিথিদের বাদশাহী কায়দায় আপ্যায়িত করেন। আড়াই কোটি টাকার ৭ ঘণ্টার পার্টির সময় ইয়টটি ত্রিশ নট গতিতে সাগর উপকূল পরিভ্রমণ করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ’ধরনের বহুমূল্য সাগর ক্রুইজ সম্পর্কে পাঠকের ধারণা না থাকাই সঙ্গত। কেউ ঘটনাটিকে অবাস্তব বা দিবাস্বপ্ন বলে চাইলে উড়িয়েও দিতে পারেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, মধ্যপ্রাচ্যেও বিলিওনার রাজপুরুষ বা শেখদের মতো আমাদের দেশের বিপুল সম্পদশালী কিছু বিলাসী ব্যক্তি রাজভোগের পিছনে এভাবে কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন উড়িয়ে দিচ্ছেন। নিজেদের জৌলুস, ক্ষমতা এবং প্রভাবের ‘শোকেস’ এর পর্দা তারা কিছু টার্গেট করা বিশেষ ব্যক্তির সামনে এভাবে মেলে ধরছেন। বাংলাদেশে কারো ব্যক্তিগত ইয়ট বা প্রমোদতরি আছে, এই তথ্য নিশ্চয়ই আমাদের রাজস্ব বোর্ডের জানা নেই। মুম্বাইর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যক্তিগত প্রমোদ অনুষ্ঠান আয়োজন করে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে এই খবরও সম্ভবত আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা নেই। অবশ্য জানা থাকার কথাও নয়। কারণ এগুলোর আয়োজকরা যেমন বিত্তেপ্রভাবে প্রচণ্ড ক্ষমতাধর, তেমনি তারা সদাসর্বদা ক্ষমতার রাজনীতির আশ্রয়ে থাকেন। আবার কেউ বা রাজনীতি এবং ব্যবসা দু’টোরই শিরোমনি। শিরোমনিদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে ঘাটাঘাটির মত আত্মঘাতি কাজে হাত দেয়, সাধ্য কার! আলোচ্য প্রমোদতরির মালিক হচ্ছেন একজন স্বনামধন্য কর্পোরেট নির্বাহী। ক্ষমতাধর এবং ক্ষমতা প্রত্যাশী প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে তিনি বিশেষ এবং ঘনিষ্ট যোগাযোগ রাখেন। নিখুঁত যোগাযোগ সেতু গড়ে নিয়েছেন আর্থিকপ্রশাসনিক এবং স্পর্শকাতর এজেন্সির বাছাই করা পদাধিকারীর সাথে। সঙ্গতকারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাছাড়া তার ব্যক্তিগত প্রমোদতরিও নেই! বর্ণিত ইয়টটি সাগর উপকূলে পর্যটক পরিবহন করে থাকে। শুধুমাত্র বিশেষ প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ব্যক্তিগত প্রমোদতরিতে রূপান্তরিত হয় এই ইয়ট। একইভাবে ব্যক্তিগত প্রমোদ বা বিলাসের অন্যান্য সামগ্রিকগুলোও ‘জনসেবার’ কাজে ব্যবহৃত হয়। শুধুমাত্র বিশেষ লগ্নে এগুলো রূপ পাল্টায়।

আর্থিক খাতের খবর অনুযায়ী দেশের সবগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের লোকসানের অংক বাড়ছে। বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ইতোমধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার মত অবলোপনকৃত ঋণসহ খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণের পরিমাণ লক্ষ কোটি টাকার ঘর ছুঁই ছুঁই। ঋণ খেলাপীরা নিজেরাই আবার ব্যাঙ্ক খুলছেন। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ খেলাপী হয়ে ঋণ পরিশোধ করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেয়ার কোন উৎকৃষ্ট উদাহরণ রাষ্ট্র বা সরকার জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। উল্টো রাঘব বোয়াল ঋণ খেলাপীরা নানা আইনি প্যাঁচে আটকে রাষ্ট্রকেই সাত ঘাটের পানি খাওয়াচ্ছে। এই কাজে তাদের নিজেদের পকেটের টাকায় হাত দিতে হচ্ছে না। খেলাপী ঋণের টাকায় তারা সর্বোত্তম আইনী সেবা কিনে নিচ্ছে। এইভাবে কৈ এর তেলে কৈ ভেজে তারা একদিকে ব্যাঙ্কিং এর মত স্পর্শকাতর আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে অন্যদিকে নিজেদের গায়ে আভিজাত্য এবং মানবসেবার ঝলমলে কৃত্রিম লোগো সেঁটে রেখে বোকা বানাচ্ছে দেশের কোটি কোটি মানুষকে। এদেশে কয়েক হাজার টাকা কৃষিঋণ পরিশোধে ব্যর্থ কৃষকের সম্পত্তি ক্রোক হয়, জেলজরিমানা হয়। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপীদের কোন শাস্তি হয়না। ব্যাঙ্কের টাকা তো সাধারণ মানুষের টাকা, এই টাকা নয়ছয় করার অধিকার যেমন ব্যাঙ্ক কর্তা বা পরিচালকদের নেইতেমনি নেই বিশাল অংকের ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর খেলাপী রাখার অধিকারও কারো নেই। তিনি যত বড় উদ্যোক্তা বা ক্ষমতাধর হোন না কেন, তাকে বিচারের আওতায় এনে খেলাপি অর্থ উদ্ধার করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এরা ক্ষমতা ও প্রভাবের জোরে ধরাছোয়ার বাইরে থেকেছেনথাকছেন। অথচ ঋণের টাকায় এবং ভোগবিলাস ও প্রমোদ খাতে উড়িয়ে দিচ্ছেন শত শত কোটি টাকা। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বেশ হৃষ্টপুষ্ট। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপী গোষ্ঠী অর্থনীতিকে এই অবস্থানে আনেনি। এদেশের কৃষক, প্রবাসী শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মিলিত প্রচেষ্টায় অর্থনীতির গতি দ্রুততর হয়েছে। খেলাপীরা নিজেদের ভোগবিলাস, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ শক্তিশালী করতেই ব্যবহার করছেন অনাদায়ী ব্যাঙ্ক ঋণের টাকা। ব্যাঙ্কিং তথা আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে খেলাপি ঋণ পুণরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিশিষ্ট ক’জন ঋণ খেলাপীকে প্রতি বছর বিশেষ সম্মাননা দেয়া উচিত। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক এবং স্বীকৃতির ব্যবস্থা আছে। এর উল্টো ব্যবস্থা হিসাবে শীর্ষ ঋণ খেলাপীদের জন্য ‘বিশেষ সম্মাননা’ চালুর বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় বিবেচনায় রাখতে পারে। প্রতিবছর এদের মধ্য থেকে বাছাই করা কয়েকজনকে ‘সম্মাননা’ দিলে এই কৃতীদের ব্যাপারে দেশবাসী অন্তত স্পষ্ট ধারণা পাবেন।

LEAVE A REPLY