নেছার আহমদ

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এবং সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নের যে রোল মডেল তৈরি করেছে তা একটি বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশে দেশে শিল্প উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের যে মহা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তাতে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সমূহের বিশেষজ্ঞ মহলে সাড়া জাগিয়েছে এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুনভাবে আশার সঞ্চার হয়েছে। দেশে একটি সুন্দর বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে তিনি বেজা আইন পাস করেছেন এবং দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। এতে দেশ বর্তমানে বিশ্বে এক উল্লেখযোগ্য একটি স্থানে পৌঁছে গেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ইচ্ছা হলো দেশ শিল্পায়নে এগিয়ে যাক এবং বেকার সমস্যা দূর হৌক। দেশের মানুষ স্বাবলম্বি হৌক।

৬ মে ২০১৭ কক্সবাজারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি উন্নয়নের বিমান যাত্রা ঘোষণা করে বলেন, “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের জনগণের জন্য দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। স্বাধীন দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেন এটা আমি চাই। আমি শাসক নেই, জনগণের সেবক। দেশের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করব।” [সূত্র ঃ দৈনিক জনকণ্ঠ ৭ মে ২০১৭]

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আলোকে বলতে চাই, সম্প্রতি সময়ে দেশের বাইরে একটি সেমিনারে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ আমার হয়েছে। সেখানে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল “শিল্পায়নই দেশের অগ্রগতি”। আলোচনায় যেটা মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আলোচনা হয়েছে তা হলো, “একটি দেশের উন্নয়নের ধাপ হলো তিনটি”। যেমনবাণিজ্যিক, () ফার্মিং (ঋরৎসরহম), () শিল্পায়ন।

একটি দেশের উন্নয়নের সর্ব্বোচ্ছ পর্যায়ে যাওয়ার জন্য তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সে হিসেবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এধাপগুলো অতিক্রম করে ইউরোপকে শিল্পায়নের শেষ পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ১৫০ বছর। অন্যদিকে চীন এটি অতিক্রম করেছে মাত্র ৭০/৮০ বছরে। চীনের অর্ধেক সময় লাগার পিছনে কারণ হলো ইউরোপের অগ্রযাত্রায় যে ভুলত্রুটিগুলো ছিল তা তাঁরা সংশোধনের সুযোগ পেয়েছে। যার কারণে চীন মাত্র ৭০/৮০ বছরে শিল্পায়নের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সে আলোকে বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে। শিল্পায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে তাদের লাগবে মাত্র ৩০/৪০ বছর। চীনের অর্ধেক সময় আমাদের প্রয়োজন, এ জন্যই যে আমাদের সামনে ইউরোপ এবং চীনের উদাহরণ রয়েছে। তাদের দোষত্রুটি ও ভুল ভ্রান্তিগুলো আমরা যথাসম্ভব পরিহার করে উন্নয়নের সর্বশেষ ধাপ অতি সহজেই অতিক্রম করতে পারব। এটি হলো আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশের শিল্পায়নের অগ্রযাত্রার চিত্র।

আমি বর্ণিত বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরছি, এ জন্যই যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার দেশপ্রেম এবং দেশের ও দেশের জনগণের প্রতি তাঁর যে দায়বদ্ধতা দেশকে উন্নয়নের শেষ ধাপে পৌঁছাবে এটি আমরা আশা করি এবং তা সম্ভব।

শেখ হাসিনার আহ্বানে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে দেশে বসবাসকারী বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাঙালিরা এদেশে শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শিল্প স্থাপনে অনেকে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু দেশে শিল্প স্থাপনের জন্য যে প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রতিনিয়ত আমাদেরকে হয়রানীর মধ্যে ফেলছে এবং শিল্প স্থাপন করতে গিয়ে যে অত্যাচার ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে প্রতিনিয়ত পরতে হচ্ছে। একজন ভূক্তভোগী হিসেবে আমি এর সাক্ষী। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবিষয়ে।

একটি শিল্প স্থাপনের জন্য নিম্নবর্ণিত স্তরগুলো একের পর এক বাস্তবায়ন করতে হয়। যা আমি এখানে তুলে ধরছি।

১। শিল্প স্থাপন করার জন্য পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা। দেশে বর্তমানে জমির উচ্চ মূল্যের কারণে প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যায় এবং জমি কিনার পর ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভুলের কারণে বিনিয়োগকারীকে এর মাশুল গুণতে হয়।

২। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর হতে কোম্পানী গঠন, নিবন্ধন এবং অনুমোদনের জন্য সময় ক্ষেপণ হয় এবং বিশাল অংকের টাকার অপচয় হয়।

৩। প্রকল্প ঋণের জন্য সরকারী ব্যাংক সমূহে বছরের পর বছর নানা রকম জটিলতার মধ্যে বিনিয়োগকারীকে হাবুডাবু খেতে হয়। ব্যাংকের হয়রানী অনেক সময় অসহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। তা দেখে অনেক উদ্যোক্তা সামনে এগোনোর সাহস পায়না। প্রকল্প এখানেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া রয়েছে ব্যাংকের উচ্চ হারে সুদ। যা বিশ্বের কোথাও নেই।

৪। বেসরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন হলেও উচ্চ সুদে মেশিনপত্র আমদানীর জন্য ঋণপত্র খুলে যখন কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন হতে নিম্ন পর্যায়ের বাধাগুলো আসতে শুরু করে। নির্মাণ কাজ শুরুর প্রথমেই জমির মালিকানা নিয়ে ভূমি ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার সুযোগে কিছু টাউট বাটপার সহযোগে বিনিয়োগকারীর পকেট হতে বড় অংকের টাকা খোয়ানোর উদ্দ্যেশে বিভিন্ন রকম ঝামেলা শুরু করে। বিনিয়োগকারীর দোষ তিনি বড় অংকের বিনিয়োগ করবেন এবং তিনি বড় লোক। সুতরাং সে টাকা ওয়ালা, অন্যরা গরীব। এসব গরীবদের দরদী হয়ে জোট বাঁধে এলাকায় টাউট বাটপার, রাজনৈতিক নেতা নামধারী ও কর্মীরা। এসব ঝামেলার সাথে যুক্ত হয়ে যায় প্রসাশন। প্রসাশনও সুযোগ বুঝে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে শিল্প মালিক বা বিনিয়োগকারীকে বড় অংকের টাকা খরচে বাধ্য করেন। অনেকে যে কোন একটি কাগজ নিয়ে কোর্ট হতে ১৪৪ বা ১৪৫ ধারার নোটিশ এনে কাজ বন্ধ করে ব্ল্যাকমেলিং শুরু করে। কোর্টের কাগজ নিয়ে প্রসাশনও টাকা কামানোর সুযোগ পায়।

৫। এরপর আসে রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যবসার নামে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা নীরব চাঁদাবাজী।

এ যেন এক মগের মুল্লুক। যে যেদিকে পারছে প্রকল্প নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দু’পয়সা কামানোর ধান্ধা। অন্যদিকে শিল্প মালিক যে কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন তাঁর “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা”।

এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্মাণ কাজ দীর্ঘ হয়। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। পরিশেষে শিল্প উৎপাদনে যাবার আগেই রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয় এবং দেনার দায়ে ব্যাংকে ঋণের সুদ দিতে না পেরে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যথা খুড়ে খুড়ে চলে, এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। এটি বর্তমানে আমাদের দেশে শিল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে বাস্তব এবং প্রধান বাঁধা। স্থানীয় এসব প্রতিবন্ধকতা মিমাংসার জন্য যত উপরের নেতাদের কাছে যাক না কেন ফলাফল শূন্য। বরঞ্চ ধাপে ধাপে নেতার মান অনুযায়ী খরচ বাড়তে থাকে।

শিল্পের মালিকের একটাই অপরাধ সে পয়সাওয়ালা। প্রতিবন্ধকতা যারা করেন তারা গরীব। গরীব দরদী জননেতারা এটাকে বিনিয়োগ করে গরীব দরদী সেজে ফায়দা তুলে দু’পয়সা আয়ের এবং চাঁদাবাজীর পথ তৈরি করেন। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সেতো বসে আছে কখন একটু ঘাপলা পায়। একটু ঘাপলা হওয়া মানেই তাঁর আয়ের পথ তৈরী হওয়া। বাংলাদেশে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ভূমি আইনের আওতায়। মৌরসী সম্পত্তি এবং একান্নবর্তী পারিবারিক জায়গা হওয়ার কারণে খতিয়ানভুক্ত জায়গা পরিবারের নিজেদের আপোস মিমাংসা অনুযায়ী একেক জায়গায় দখলে থাকে। খতিয়ান ভূক্ত নামের কারণে দখলে না থাকা সত্ত্বেও টাউট বাটপারের মাধ্যমে এক জনের দখলের জায়গা আরেকজনে বিক্রি করে দেয়। এতে শুরু হয় ঝামেলা। কারো দখলস্বত্ব আবার কারো খতিয়ানের স্বত্ব। এনিয়ে দ্বন্ধ শুরু হলে মিমাংসাকারীর ভূমিকা নেন রাজনৈতিক নামধারী নেতা বা সামাজিক টাউট শ্রেণী। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উদ্যোক্তা। জায়গার মালিকানা স্বত্বের মাঝে উদ্যোক্তার কোন দোষ না থাকলেও যেহেতু সে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে। ফলে সুযোগ বুঝে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে একটা মধ্যস্থতা বা মিমাংসায় আসতে বাধ্য করা হয়।

আমাদের গরীব দরদী জননেতারা সুযোগ বুঝে গরীবের মাথার উপর হাত বুলিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করে। এটি এখন আমাদের নিত্য পরিস্থিতি, শিল্প মালিকেরা মুখ বুঝে সহ্য করে যায় বৃহত্তর স্বার্থের কারণে। এদের খপ্পরে পড়ে যায় তাঁরা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন এবং দেশের ও দেশের জনগণের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও শিল্পায়নে তার আগ্রহ সবই মার খেয়ে যায় বর্ণিত প্রতিবন্ধকতার কারণে। যার কারণে বিনিয়োগ এবং উন্নয়নে দেশ পিছিয়ে পড়ে।

আমি আমেরিকা প্রবাসি এক বিনিয়োগকারীকে চিনি ও জানি। তিনি দীর্ঘ ত্রিশ বছর প্রবাসে থেকে বিশাল অর্থ বিত্তের অধিকারী হয়েছেন। মধ্যবয়সে এসে তিনি দেশপ্রেমের তাগিদে দেশে এসে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে জনগণের জন্য ও দেশের জন্য কিছু করার তাগিদে শিল্প স্থাপন করেছেন। কিন্তু বর্ণিত এসব সমস্যার কারণে পুনরায় বিদেশ ফেরত গেছেন।

এসব সমস্যার কারণে তিনি এতই কষ্ট পেয়েছেন যে সব কিছু ফেলে তিনি আবার বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এ সমস্যাগুলো হলো নির্মাণকালীন সময়ের। কারখানা নির্মাণের পর উৎপাদনে গেলে তখনতো শুরু হয় নতুন উৎপাত। এসব এখানে বর্ণনা নাই বা করলাম, ভুক্তভোগী মাত্রই তা জানেন।

শিল্প স্থাপনের সাথে জড়িত এবং রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা বা প্রসাশন যাদের দ্বারাই এ প্রতিবন্ধকতাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে, তাঁদের প্রতি অনুরোধ সামান্য কিছু লাভের জন্য দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন ও শিল্পায়নকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবেননা। সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হব এবং দেশের উন্নয়নে বাধা গ্রস্থ হবে। আসুন সকলে মিলে আমরা এদেশটাকে গড়ে তুলি এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তৈরিতে সহযোগী হই।

LEAVE A REPLY